লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো—দুজনের সঙ্গেই ক্লাব ফুটবলে সতীর্থ হিসেবে খেলেছেন আনহেল দি মারিয়া। ফুটবল ইতিহাসের এই দুই মহাতারকা নিয়ে তাঁর মূল্যায়ন তাই আলাদা গুরুত্ব বহন করে। রোজারিওর শেকড়, জীবনের সংগ্রাম, শিরোপাভরা ক্যারিয়ার আর মেসি–রোনালদো বিতর্ক—সব মিলিয়ে নিজের বাড়িতে বসে স্প্যানিশ দৈনিক এএস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের গল্পটাই খুলে ধরেছেন বিশ্বকাপজয়ী এই আর্জেন্টাইন তারকা।
রোজারিওতে ফেরা, এক পূর্ণ চক্র
রোজারিও শহরের পেরদ্রিয়েল স্ট্রিট—ইটের টুকরা দিয়ে বানানো গোলপোস্ট আর সূর্য ডোবার আগ পর্যন্ত খেলা। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল আনহেল দি মারিয়ার ফুটবলযাত্রা। ১৭ বছর পর সেই রাস্তায় ফিরেছেন তিনি বিশ্বজয়ী তারকা হয়ে। তবে তাঁর ভাষায়, এটি নস্টালজিয়ার চেয়ে বেশি আনন্দের।
“আমি যে জীবনটা পেয়েছি, যে ক্যারিয়ার—সবকিছুর জন্যই কৃতজ্ঞ,” বলেন দি মারিয়া।
স্বপ্নের চেয়েও বড় বাস্তবতা
ছয়টি ক্লাব, ১৪৫ আন্তর্জাতিক ম্যাচ, ৩৭টি শিরোপা—সংখ্যাগুলো শুনতে রূপকথার মতো। কিন্তু দি মারিয়ার মতে, তাঁর স্বপ্ন ছিল কেবল রোজারিও সেন্ট্রালের মূল দলে খেলা।
“এরপর যা হয়েছে, তা ত্যাগ আর সুযোগ কাজে লাগানোর গল্প। যতবার সুযোগ এসেছে, আমি উঠেছি,” বলেন তিনি।
শেকড় আর সংগ্রাম
সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই ফুটবলারের জীবনে সংগ্রাম ছিল নিত্যসঙ্গী। বাবা কয়লা তুলতেন। ১৬ বছর বয়সে দিয়েছিলেন কঠিন এক শর্ত—ফুটবলে কিছু করতে না পারলে বাবার সঙ্গে কাজে নামতে হবে।
“মা অনুরোধ করায় বাবা শেষ সুযোগটা দিয়েছিলেন। সেখান থেকেই সব বদলে যায়,” স্মৃতিচারণা করেন দি মারিয়া।
বিশ্বকাপ থেকে কোপা—সব শিরোপাই বিশেষ
৩৭টি ট্রফির মধ্যে কোনটি সবচেয়ে প্রিয়—এই প্রশ্নে দ্বিধাহীন উত্তর, সবকটিই। তবে আবেগের জায়গা থেকে এগিয়ে ২০২১ কোপা আমেরিকা।
“২৮ বছর পর জাতীয় দলের শিরোপা, ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনালে আমার গোল—ওটাই আমার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল,” বলেন তিনি।
রিয়াল মাদ্রিদ অধ্যায় ও না বলা বিদায়
রিয়াল মাদ্রিদে ‘লা দেসিমা’ জয়ের ফাইনালে সেরা খেলোয়াড় হয়েও আলোচনার বাইরে থাকা নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই তাঁর। তবে ক্লাব ছাড়ার ঘটনাটা আজও কষ্ট দেয়।
“আমি যেতে চাইনি। অনেক গল্প বানানো হয়েছিল, সবই মিথ্যা। শেষ দিন পর্যন্ত থাকতে চেয়েছিলাম,” বলেন দি মারিয়া।
মরিনিও ও আনচেলত্তি
জোসে মরিনিওকে তিনি বলেন ‘নাম্বার ওয়ান’। আর কার্লো আনচেলত্তি—যিনি তাঁকে উইঙ্গার থেকে মিডফিল্ডারে রূপান্তর করে নতুন জীবন দিয়েছেন।
“তিনি বলেছিলেন, আমার জন্য মাঠে জায়গা খুঁজে নেবেন। সেটাই আমার ক্যারিয়ার বদলে দেয়।”
মেসি না রোনালদো—সেরা কে?
সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নে দি মারিয়ার উত্তর স্পষ্ট:
“রোনালদো এক নম্বর হতে অবিশ্বাস্য পরিশ্রম করেছে। কিন্তু মেসি আলাদা। ও মাঠে নামলেই বোঝা যায়—সে ঈশ্বরের আশীর্বাদ পাওয়া এক জাদুকর। পরিশ্রমে সেরা হওয়া যায়, কিন্তু মেসির প্রতিভা জন্মগত।”
ম্যারাডোনা থেকে শেখা
ডিয়েগো ম্যারাডোনা তাঁকে শিখিয়েছিলেন চাপমুক্ত ফুটবল।
“মাঠকে নিজের বাড়ির আঙিনা মনে করতে বলতেন। তাহলে ভয় থাকে না,” বলেন দি মারিয়া।
বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
কিলিয়ান এমবাপ্পেকে তিনি বর্তমান বিশ্বের সেরা মনে করেন। তরুণদের মধ্যে তাঁর চোখে সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম মাস্তানতুয়োনো ও নিকো পাজ।
অবসরের পর কোচিংয়ে আসার পরিকল্পনাও আছে—লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে নিয়ে।
শেষ কথা
বিশ্বজয়ী ক্যারিয়ার, কিন্তু বিনয় অটুট। রোজারিওর সেই ইটের গোলপোস্ট আর বিশ্বকাপ ট্রফি—দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আনহেল দি মারিয়া যেন প্রমাণ করে দেন, শেকড়কে আঁকড়ে ধরেই আসলে আকাশ ছোঁয়া যায়।
